22 C
Bangladesh
Monday, November 29, 2021
Google search engine

সর্বশেষ পোস্ট

বগুড়া বিমানবন্দর চালু হলেই পাল্টে যাবে উত্তরের অর্থনীতি

স্টাফ রিপোর্টার:
১৯৮৭ সালে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বগুড়া বিমান বন্দর নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই থেকে প্রায় দুই যুগ অতিবাহিত হলেও চালু না হয়নি। তবে বগুড়া বিমানবন্দর চালু হলেই পাল্টে যাবে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি। এই অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি পৌঁছে যেতে পারে বিদেশি ক্রেতাদের হাতে। ফিরে আসবে ব্যবসায়ীদের গতি ও সৃষ্টি হবে শিল্পনগরী খ্যাত বগুড়া দেশি-বিদেশি বিনোয়োগকারীদের জন্য অবারিত সুযোগ।


বগুড়া বিমানবন্দর চালু হওয়াকে ঘিরে রাজধানী ঢাকার পর একমাত্র বগুড়াই হয়ে উঠতে পারে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এমনটিই প্রত্যাশা করছেন এ অঞ্চলের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।


স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এ জেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক শিল্প-কারখানা রয়েছে। তারকা খচিত একাধিক হোটেল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু, সরকারি-বেসরকারি একাধিক মেডিকেল কলেজ রয়েছে বগুড়ায়। পাশাপাশি কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী ফাউন্ড্রি শিল্প, কাগজ, সিরামিক, পাটজাত পণ্য এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস ও ওয়ান ফার্মাসিটিক্যালস, শিপলা, ডক্টরস কেমিক্যাল, খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সকম কনজ্যুমার প্রোডাক্ট, বসুন্ধরা এলপি গ্যাস প্লান্ট, মোটরসাইকেল সংযোজন প্রতিষ্ঠান উত্তরা মোটরস, এবিসি টাইলস, শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার কারণে দেশে-বিদেশে বগুড়ার গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাছাড়া আড়াই হাজার বছরের প্রাচীণ জনপদ পু-্রবর্ধনের রাজধানী পু-্রনগরের অবস্থান বগুড়ার মহাস্থানে হওয়ায় এ জেলায় প্রতি বছর দেশি- বিদেশী পর্যটকের আনাগোনাও আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেড়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার বিদেশি পর্যটক বগুড়ায় আসেন। বাংলার প্রাচীন রাজধানী মহাস্থানগড়সহ দর্শনীয় ও ধর্মীয় একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বাণিজ্যিকভাবে বিমানসেবা চালুর মতো সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ বগুড়ায় বিদ্যমান বলে ব্যবসায়ীরা বলছেন।


এ দিকে বগুড়ায় বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন জেলার ব্যবসায়ীদের সংগঠন শিল্প ও বণিক সমিতিসহ শিল্পোদ্যোক্তারা। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, বহুদিন ধরে পড়ে থাকা বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক মানের খেলা আয়োজন করার জন্যও এ এলাকায় বিমানবন্দরটি চালু হওয়া দরকার।


সম্প্রতি শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, ক্রীড়ামোদী ও সুধীমহলের দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে বিমানবন্দন চালুর জন্য গত ১ মার্চ বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাবলু বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তবে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন ও উন্নয়নে রাজস্ব আয় এবং দেশি-বিদেশি যাত্রীদের সুবিধার্থে বাণিজ্যিকভাবে বিমানবন্দরটি চালু করার সুপারিশ করেন সংসদ সদস্য।


এ প্রেক্ষিতে ১৫ নভেম্বর সোমবার বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ(বেবিচক) এর একটি প্রতিনিধি দল বগুড়া বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছেন। এই প্রতিনিধি দল বগুড়া বিমানবন্দরের কতটুকু জমি আছে, রানওয়ে, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অফিস ও আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য অবকাঠামো বিষয়গুলো পরিদর্শন করেন। বাণিজ্যিকভাবে বিমানবন্দর চালু করতে জমি ও কিছু অবকাঠামোর কথা বলছেন প্রতিনিধিবৃন্দ।

বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এর প্রতিনিধি দলে প্রধান ছিলেন উপ-সচিব ইশারাত জাহান পান্না। এছাড়া উপ পরিচালক (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) মো: মাসুদ রনা, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো: আমিনুল হাসিব, সহ পরিচালক (সিএনএস) প্রশান্ত কুমার সাহা, সিনিয়র ড্রাফটম্যান কবির হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনে এসে বগুড়ার এই বিমানবন্দরে কি কি আছে, কি নেই প্রাথমিকভাবে পরিদর্শন করে নোট করা হয়েছে। প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষকে দেয়া হবে, সিদ্ধান্ত ওখান থেকেই আসবে বলে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এর প্রতিনিধি দলের প্রধান উপ-সচিব ইশারাত জাহান পান্না জানিয়েছেন।


এদিকে ১৫ নভেম্বর বগুড়া বিমানবন্দর চালু করতে পরিদর্শন টিমের সফর সঙ্গী বগুড়া-৭ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাবলু বলেন, বগুড়ার বিমানবন্দরটি যেন বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয় সে বিষয়ে তিনি আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। বিমানবন্দর চালু করতে কয়েকবার তিনি সংসদে কথা বলেছেন। পরে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে বিমানবন্দর চালু করার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে বগুড়া বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে একটি লিখিত প্রস্তাবনা পাঠানো হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বগুড়ায় বিমানবন্দর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৮৭ সালে। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগে ভাটা পড়ে। এর পর ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে তৎকালীন বিএনপি সরকারের শেষ দিকে এখানে বিমানবন্দর স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এ জন্য ২২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পায়। ১৯৯৫ সালে সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের পাশে ১০৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পের আওতায় রানওয়ে, কার্যালয় ভবন ও কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, রাস্তাঘাট নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়।

প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০০০ সালে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে বিমান আর ওড়েনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সরকার বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সম্প্রতি বগুড়া বিমানবন্দর চালুর দাবি জোরালো হলে বাংলাদশ বিমানবাহিনী সম্ভাব্যতা যাচাই করে। এরপর এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট দেয়া হয় সরকারকে। পরে বিমানবন্দরটি বিমানবাহিনীর (বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টরস স্কুল) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে চালু করা হয়। বর্তমানে বগুড়ার এই বিমানবন্দরটি বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।


বগুড়ায় বিমান বন্দর চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বগুড়ার শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি মাছুদুর রহমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-অর্থনীতি, কৃষিসহ সব দিক থেকে এগিয়ে বগুড়া। বগুড়ার অনেক কৃষি পণ্য এখন বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। নতুন শিল্পোদ্যোক্তারাও এখানে শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসছেন। অর্থনৈতিক অঞ্চলও হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালু করা জরুরি। কারণ প্রাচীন এই শহরটি ব্যবসা-বাণিজ্যে যতটা এগিয়েছে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব ঠিক ততটাই পিছিয়ে দিয়েছে।


তাছাড়া সড়কপথে ঢাকা থেকে বগুড়া আসতে এখন কমবেশি ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। পথের ভোগান্তির কারণে বগুড়ায় কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও রপ্তানিকারক আসতে চান না। বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা না এলে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন তেমন কাজে আসবে না।


শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার জামিলুর রহমান বলেন, এ স্টেডিয়াম আইসিসি থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু মর্যাদা পেয়েছিল। ক্রিকেটারদের যাতায়াতের সমস্যাসহ নানা কারণে এ ভেন্যুতে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক কোনো ম্যাচ হচ্ছে না। এখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে গেলে নতুন করে আইসিসির কাছ থেকে স্বীকৃতি নবায়ন করতে হবে। বিমানসেবা চালু ছাড়া কোনোভাবেই তা আদায় করা সম্ভব নয়।


বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বগুড়ার চারতারকা হোটেল নাজ গার্ডেনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোকরানা বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় বিমানবন্দর না থাকায় এরইমধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন চট্টগ্রামে চলে গেছে। বগুড়ার সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এছাড়া সহজ রেলপথও নেই। তাই ভৌগোলিক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে দ্রুত বিমানবন্দর চালু করা জরুরি।


পাঁচতারকা হোটেল মমইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হায়দার বলেন, বগুড়ায় বিমান নেই, এটা ভাবাই যায় না। জনগণের চাহিদার কথা বিবেচনায় এনে বিসিএল প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমরা নিজস্ব হেলিকপ্টার চালু করেছি। ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছি। তবে বগুড়ায় বিমানবন্দর চালু হলে অনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা হবে।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক জানান, বর্তমানে বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিক রুটে সচল করতে আরো তিন হাজার ফুট রানওয়ে সম্প্রসারণ, তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং যাত্রী ও মালামাল ওঠানামাসহ অন্যান্য কাজে ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য বগুড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মেলেনি। অনুমতি মিললেই তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবেন। তাছাড়া ১৫ নভেম্বর বেবিচকের ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দল বিমানবন্দর বাণিজ্যিকভাবে চালু করার বিষয়ে পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন মোতাবেক কোন নির্দেশনা পাওয়া গেলেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

লেটেস্ট পোষ্ট

ফেয়ার & লেডি

spot_img

অবশ্যই পড়ুন

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.